দৈনন্দিন জীবনে মধুর ১০টি ব্যবহার জেনে নিন

মধু কি? এক কথায় মধু হচ্ছে এক প্রকারের মিষ্টি ও ঘন তরল পদার্থ, যা মৌমাছি ও অন্যান্য পতঙ্গ ফুলের নির্যাস হতে তৈরি করে এবং মৌচাকে সংরক্ষণ করে। খাদ্য গুনের পাশাপাশি এটি উচ্চ ঔষধিগুণ সম্পন্ন একটি ভেষজ তরল। কেবল মানুষ নয়, প্রাণী জগতের আরও অনেক প্রাণীরই পছন্দের শীর্ষে আছে এই মধু। জেনে রাখুন, মধু(Honey) হচ্ছে এমন একটি উপাদান যা কখনো নষ্ট হয় না। কেননা মধুতে আদ্রর্তার পরিমাণ থাকে খুবই কম। প্রাকৃতিক ও অপ্রক্রিয়াজাত মধুতে মাত্র ১৪% হতে ১৮% আর্দ্রর্তা থাকে। আর্দ্রর্তার মাত্রা ১৮% এর নিচে যতক্ষণ থাকে, ততক্ষণ মধুতে কোন জীবাণু বংশবৃদ্ধি করতে পারে না। তবে পাস্তুরীকৃত মধুতে তার প্রাকৃতিক ঔষধি গুণাবলী হ্রাস পায়। সহস্র বছরের প্রাচীন খাদ্য এই মধু, অথচ আজও হ্রাস পায়নি এর আবেদন এতটুকু। বরং জানলে বিস্মিতই হবেন যা কি চমৎকার সব উপযোগিতা আছে মধুর আমাদের দৈনন্দিন জীবনে। আসুন জেনে নেই প্রাত্যহিক জীবনে মধুর ১০টি ব্যবহার!

১)তৎক্ষণাৎ শক্তি জোগাতে-
মধু তাপ ও শক্তির একটি অত্যন্ত ভালো উৎস। এতে যে শর্করা থাকে তা সহজেই হজম হয় ও রক্তের সাথে মিশে যায়। মধুতে বিদ্যমান ডেক্সট্রিন সরাসরি রক্তে প্রবেশ করে এবং তাৎক্ষণিকভাবে ক্রিয়া করে। ফলে দেহ সহজেই পায় শক্তির জোগান। এবং অল্প সময়েই। শীতের ঠান্ডায় এটি দেহকে গরম রাখে। দুই চা চামচ মধু এক কাপ ফুটানো পানির সঙ্গে খেলে শরীর ঝরঝরে ও তাজা থাকে।

২)দূর করে কোষ্ঠবদ্ধতা ও অ্যানিমিয়া-
১ চা চামচ খাঁটি মধু ভোরবেলায় খালিপেটে পান করলে কোষ্ঠবদ্ধতা এবং অম্লত্ব দূর হয়। সেই সাথে উপকার পাওয়া যায় রক্ত শুন্যতা বা অ্যানিমিয়াতেও। মধু রক্তের হিমোগ্লোবিন গঠনে সহায়তা করে বলে এটি রক্তশূন্যতায় বেশ ফলদায়ক। এতে থাকে খুব বেশি পরিমাণে কপার, লৌহ ও ম্যাঙ্গানিজ।

আরো পড়ুন  মিলনের সময় যেভাবে বুঝবেন আপনার সঙ্গী যৌ’নতায় সুখ পাচ্ছে

৩)জীবাণুনাশক হিসাবে-
দেহের ক্ষত এবং ফোঁড়ার ওপর মধু(Honey) এবং চিনি চমৎকার কাজ করে থাকে। এটি যে কোনো ব্যথাকে প্রশমিত করে এবং জীবাণুনাশকের কাজ করে। সম পরিমাণ মধু ও চিনির সাথে দারুচিনি গুঁড়ো মিশিয়ে ব্যথা বা ফোড়ার স্থানে লাগান। সম্ভব হলে হালকা ম্যাসাজ করুন। ম্যাজিকের মতন কাজ করবে। পিপড়া বা মৌমাছির কামড়ে আক্রান্ত স্থানে মধু লাগালে ব্যথা কমে যায়। মধুতে পানি স্বল্পতার কারণে শরীরের ক্ষতস্থান থেকে পানি শুষে নিতে পারে। ফলে সংক্রামক জীবাণু অনুকূল পরিবেশ পায় না। তাছাড়া সংক্রামক রোগের জীবাণু বা ব্যাকটেরিয়ার কোষের তরল পদার্থের চেয়ে মধুর ঘনত্ব বেশি বলে মধু জীবাণুর সংস্পর্শে এলে ব্যাকটেরিয়ার কোষ থেকে পানি বেরিয়ে মধুতে চলে আসে। ফলে পানি শূন্যতার কারণে জীবাণুর কোষ ধ্বংস হয়ে যায়।

৪) অনিদ্রা দূর করতে-
হালকা গরম দুধের সঙ্গে মিশ্রিত মধু একটি প্রশান্তিদায়ক পানীয় ও অনিদ্রা দূর করতে অত্যন্ত উপকারী। আধা গ্লাস দুধের সাথে ২ চা চামচ মধু মিশিয়ে খেলে তা নিদ্রা আনতে সহায়ক। এবং ঘুমটাও গভীর ও শান্তির হবে।

৫) সর্দি কাশির চিকিৎসায়-
ফ্যারেনজাইটিস ও সাধারণ সর্দি-কাশিতে খুবই উপকারী বস্তু হচ্ছে এই মধু। পেনসিলভেনিয়া স্টেট কলেজের পরীক্ষায় দেখা গেছে বাজারে যত ঔষধ পাওয়া যায় তার চেয়ে অনেক বেশী কার্যকর এক চামচ মধু। মধুর ভাইরাস প্রতিরোধী ক্ষমতা উচ্চ। এক চা চামচ মধুর সাথে এক চা চামচ তুলসী পাতার রস(Tulsi leaf juice) মিশিয়ে খেলে কাশি উপশম হয়। গলা ব্যথা কমাতে হালকা গরম পানির সাথে মধু ও লবণ মিশিয়ে গারগল করলে উপকার মিলবে।

আরো পড়ুন  ডায়াবেটিস থেকে আজীবন মুক্ত থাকার ৯টি প্রমাণিত উপায়

৬) দাঁতের চিকিৎসায়-
দাঁতের স্বাস্থ্য রক্ষায় মধু একটি প্রাকৃতিক উপাদান। এটা দাঁতের ওপর ব্যবহার করলে দাঁতের ক্ষয়রোধ করে। দাঁতে পাথর জমাট বাঁধা রোধ করে এবং দাঁত পড়ে যাওয়াকে বিলম্বিত করে। মধু রক্তনালিকে সম্প্রসারিত করে দাঁতের মাড়ির স্বাস্থ্য রক্ষা করে। যদি মুখের ঘায়ের জন্য গর্ত হয়, সামান্য মধু ক্ষতস্থানে লাগালে এটি সেই গর্ত ভরাট করতে সাহায্য করে এবং সেখানে পুঁজ জমতে দেয় না। মধু(Honey) মিশ্রিত পানি দিয়ে গড়গড়া করলে মাড়ির প্রদাহ দূর হয়।

৭)হজমের সমস্যা দূর করতে-
মধু পাকস্থলীর কাজকে জোরালো করে এবং হজমের গোলমাল দূর করে। এর ব্যবহার হাইড্রোক্রলিক এসিড ক্ষরণ কমিয়ে দেয় বলে অরুচি, বমিভাব, বুক জ্বালা এগুলো দূর করা সম্ভব হয়। অ্যাসিডিটি বা অন্য কোনও সাধারণ কারণে পাকস্থলীতে ব্যথা হলে গরম পানির সাথে মধু ও তার অর্ধেক পরিমাণ দারুচিনি মিশিয়ে পান করুন। ব্যথা নিরাময় হবে।

৮)সকালের নাশতায়-
দিনভর সতেজ থাকতে সকালে রঙ চা পান করুন প্রয়োজনমত মধু ও সামান্য লেবু মিশিয়ে। মস্তিষ্কের কর্মক্ষমতা বাড়বে ও লম্বা দিনের জন্য প্রস্তুত হয়ে উঠবে শরীর। গরমের দিনে পানি শুন্যতা রোধ করতে প্রতি এক লিটার পানিতে ৫০ মিলি লিটার মধু মিশিয়ে পান করুন সকাল সহ দিনের যে কোনও সময়। দারুচিনি(Cinnamon) ও মধু মিশিয়ে পেস্ট তৈরি করুন, সাথে দিতে পারেন কমলা বা লেবুর খোসার মিহি কিমা। এই মিশ্রণ বয়ামে ভরে ফ্রিজে সংগ্রহ করুন, এবং রোজ সকালে খান ২ চামচ। চাইলে ব্রেডের সাথে জ্যাম বা জেলীর বদলে খেতে পারেন। স্বাদে যেমন মজাদার, তেমনই এই মিশ্রণ আপনার হার্টকে রাখবে সুস্থ। হৃৎপিণ্ডে চর্বি জমা সহ আরও অনেক হৃদরোগ প্রতিরোধ করবে।

আরো পড়ুন  ত্বকের সৌন্দর্য বাড়াতে লেবুর ব্যবহার

৯)আর্থরাইটিসের ব্যথা কমাতে-
এক কাপ গরম পানির মধ্যে দু চামচ মধু আর এক চামচ দারচিনি গুড়ো মিশিয়ে খান প্রতিদিন সকাল ও সন্ধ্যা। ১ সপ্তাহ সেবনেই উপকার পাবেন৷ নিয়মিত খেতে পারলে খুব ভালো।

১০) রূপচর্চায় ব্যাপক ব্যবহার-
রূপচর্চার ক্ষেত্রে মাস্ক হিসেবে মধুর ব্যবহার বেশ জনপ্রিয়। বিশেষ করে শুষ্ক ত্বকের জন্য মধু জাদুর মতন কাজ করে। রুক্ষ্ম ত্বকের সমস্যায় যে কোনো ফেস প্যাকের সাথে মিলিয়ে কিংবা কাঁচা দুধের সাথে পেস্ট তৈরি করে মধু লাগান মুখে। শুকিয়ে গেলে ধুয়ে ফেলুন। ত্বক হয়ে উঠবে নরম ও মোলায়েম। মনে রাখুন- মধু অনেক রোগের জন্য মহৌষধ হলেও ডায়াবেটিস(Diabetes) রোগের ক্ষেত্রে মধু খুবই বিপজ্জনক। কারণ এটি রক্তে সরাসরি শোষিত হয়, ফলে সহজেই দেহের রক্ত শর্করাকে উচ্চস্তরে নিয়ে আসে। সুতরাং ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য মধু গ্রহণ নিষেধ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *